
গাইবান্ধার ফুলছড়িতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ‘উচ্চতর গ্রেড’ ও ‘টাইম স্কেল’ পাইয়ে দেওয়ার নামে চলছে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসকে কার্যত জিম্মি করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বেপরোয়া সিন্ডিকেট। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযোগ উঠেছে কঞ্চিপাড়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মমিনুল হাউলিদারের বিরুদ্ধে। শিক্ষা অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে শিক্ষকদের ফাইল আটকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই প্রভাবশালী শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি বিধি মোতাবেক চাকরিজীবীদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও ফুলছড়িতে তা পরিণত হয়েছে ‘ঘুষের হাটে’। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ফাইল জমা হলেই নানা ত্রুটির অজুহাতে তা মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। আর এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দেনদরবার শুরু করে মমিনুল সিন্ডিকেট। ফাইল ছাড় ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিক্ষকপ্রতি হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। টাকা দিলে ফাইলের গতি বাড়ে ‘রকেটের গতিতে’, আর ঘুষ দিতে অস্বীকার করলেই নেমে আসে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি।
ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। ভুক্তভোগীদের স্বীকারোক্তিতেও বেরিয়ে এসেছে মমিনুলের বেপরোয়া বাণিজ্যের প্রমাণ। কাইয়ারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল করিম সরাসরি অভিযোগ করে জানান, নিজের এবং ছাতারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি বেগমের উচ্চতর গ্রেডের কাজের জন্য মমিনুল হাউলিদারকে অর্থ প্রদান করেছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক সুমি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার কাছ থেকে কাগজপত্র নেওয়ার সময়ই অগ্রিম দুই হাজার টাকা কেটে রাখা হয়। পরে কাজ শেষ হলে আরও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মমিনুল হাউলিদারের মুখোমুখি হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে ঘুষ গ্রহণের কথা অস্বীকার করেন। তবে ঘটনার মোড় নেয় অন্যদিকে। সংবাদ ধামাচাপা দিতে মাঠে নামে উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি নুরুল হুদা শিপুল ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন প্রতিবেদককে মুঠোফোনে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে অনুনয়-বিনয় শুরু করেন। তারা বলেন, “বিষয়টি নিয়ে কোনো নিউজ করার দরকার নেই, আমরা-আমরাই তো। দেখি আলাপ-আলোচনা করে কী করা যায়।” শিক্ষক সমিতির শীর্ষ নেতাদের এমন আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেটের শেকড় কতটা গভীরে।
এদিকে শিক্ষা অফিসের নাকের ডগায় এমন নগ্ন দুর্নীতি চললেও নির্লিপ্ত প্রশাসন। ফুলছড়ি উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাসুমুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি দায়সারা জবাবে বলেন, “উচ্চতর গ্রেডের জন্য কোনো অর্থ নেওয়ার বিধান নেই। ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একদল নীতিহীন শিক্ষক নেতার এমন চাঁদাবাজি ও শিক্ষা অফিসের নীরবতায় ক্ষোভে ফুঁসছে ফুলছড়ির সাধারণ শিক্ষক সমাজ। তারা বলছেন, মানুষ গড়ার কারিগররা যখন নিজেদের অধিকার পেতে সহকর্মীর কাছেই জিম্মি হয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিকতা ভেঙে পড়ে। অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে মমিনুলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষক ও সচেতন মহল।
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ আতিকুর রহমান আতিক বাবু, বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়, বিজ্ঞাপন বিভাগ: রওশন সরকার, 01707-480805, সম্পাদকীয় কার্যালয়: হকার্স মার্কেট, ডিবি রোড, গাইবান্ধা। যোগাযোগ: 01713-739236
Copyright © 2025 গণ উত্তরণ. All Rights Reserved.