মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উঠানে পড়ে রইল বাবার লাশ, ঘরের ভেতর জমির লড়াই: সাদুল্লাপুরে দাফন আটকে মেয়ের প্রতিবাদ

চারপাশে দাফনের ব্যস্ততা, মাইকে ভেসে আসছে জানাজার ঘোষণা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপচে পড়া ভিড়—এমন শোকাতুর আবহের ভেতরেই রচিত হলো এক চরম নির্মম বাস্তবতার চিত্র। একপাশে চাটাইয়ে মোড়ানো বাবার নিথর দেহ, আর ঠিক তার পাশেই ভাই-বোনের মধ্যবর্তী দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে পৈতৃক জমির হিসাব-নিকাশ। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নিজের আইনি ও ধর্মীয় অংশ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত বাবার খাটিয়া কবরের দিকে নিতে দেবেন না—এমন অনড় অবস্থানে শেষ পর্যন্ত থমকে গেল দাফন কাজ।

​হৃদয়বিদারক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বোয়ালীদহ গ্রামে। মৃত ব্যক্তির নাম নাজির উদ্দিন বেপারী।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাজির উদ্দিনের মৃত্যুর পর প্রথামাফিক জানাজা ও দাফনের যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু কাফন পরানোর প্রক্রিয়া চলার সময়ই আকস্মিক বাধা হয়ে দাঁড়ান মরহুমের মেয়ে হালিমা বেগম। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা—জীবদ্দশায় যে অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে, বাবার শেষ বিদায়ের আগে সেই ন্যায্য হিস্যার মীমাংসা হতে হবে।

​হালিমা বেগমের গুরুতর অভিযোগ, বাবা যখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় দুর্বল ও স্মৃতিভ্রান্ত ছিলেন, তখন সেই সুযোগে তাঁর সহোদর ভাই ইদ্রিস আলী চাতুরীর আশ্রয় নেন। তিনি একতরফাভাবে বাবার যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি নিজের নামে লিখে বা রেজিস্ট্রি করে নেন। ফলে উত্তরাধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও বাবার ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ বেদখল ও বঞ্চিত হন হালিমা।

​শোকসভার পরিবেশ মুহূর্তেই রূপ নেয় তীব্র টানাপোড়েনে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। দফায় দফায় চলে দেনদরবার। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং দাফনের পথ সুগম করতে হালিমাকে তাৎক্ষণিক দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বা আপস-রফার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

​তবে সেই আর্থিক প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন ক্ষুব্ধ মেয়ে। তিনি উপস্থিত সবাইকে সাফ জানিয়ে দেন, “আমি কোনো অনুদান বা দয়ার টাকা চাই না; চেয়েছি বাবার রেখে যাওয়া ভিটে ও জমিতে সন্তানের সমান ও আইনসম্মত অধিকার।” দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাবার খাটিয়ায় কাউকে হাত দিতে দেবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

​একদিকে রক্তের টান আর ধর্মীয় অনুশাসন, অন্যদিকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও আর্থিক কূটচাল—এই দুইয়ের মুখোমুখি অবস্থানে পুরো এলাকায় এক ভারী ও অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

​অভিযুক্ত ভাই ইদ্রিস আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, জমি হস্তান্তরের পেছনের আসল সত্য ও বৈধতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিলপত্র খতিয়ে দেখা জরুরি। ততক্ষণ পর্যন্ত এক পিতার নিথর দেহের সামনে সন্তানের অধিকার আদায়ের এই দৃশ্য পুরো জনপদেই গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

জনপ্রিয়

চার বছরের প্রেমের পর বিয়ে, পরিবার না মানায় বিষপানে নববধূ মৃত,আশঙ্কাজনক বর হাসপাতালে নেই কোনো স্বজন

error: Content is protected !!

উঠানে পড়ে রইল বাবার লাশ, ঘরের ভেতর জমির লড়াই: সাদুল্লাপুরে দাফন আটকে মেয়ের প্রতিবাদ

প্রকাশের সময়: ০৪:১৯:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

চারপাশে দাফনের ব্যস্ততা, মাইকে ভেসে আসছে জানাজার ঘোষণা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপচে পড়া ভিড়—এমন শোকাতুর আবহের ভেতরেই রচিত হলো এক চরম নির্মম বাস্তবতার চিত্র। একপাশে চাটাইয়ে মোড়ানো বাবার নিথর দেহ, আর ঠিক তার পাশেই ভাই-বোনের মধ্যবর্তী দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে পৈতৃক জমির হিসাব-নিকাশ। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নিজের আইনি ও ধর্মীয় অংশ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত বাবার খাটিয়া কবরের দিকে নিতে দেবেন না—এমন অনড় অবস্থানে শেষ পর্যন্ত থমকে গেল দাফন কাজ।

​হৃদয়বিদারক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বোয়ালীদহ গ্রামে। মৃত ব্যক্তির নাম নাজির উদ্দিন বেপারী।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাজির উদ্দিনের মৃত্যুর পর প্রথামাফিক জানাজা ও দাফনের যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু কাফন পরানোর প্রক্রিয়া চলার সময়ই আকস্মিক বাধা হয়ে দাঁড়ান মরহুমের মেয়ে হালিমা বেগম। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা—জীবদ্দশায় যে অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে, বাবার শেষ বিদায়ের আগে সেই ন্যায্য হিস্যার মীমাংসা হতে হবে।

​হালিমা বেগমের গুরুতর অভিযোগ, বাবা যখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় দুর্বল ও স্মৃতিভ্রান্ত ছিলেন, তখন সেই সুযোগে তাঁর সহোদর ভাই ইদ্রিস আলী চাতুরীর আশ্রয় নেন। তিনি একতরফাভাবে বাবার যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি নিজের নামে লিখে বা রেজিস্ট্রি করে নেন। ফলে উত্তরাধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও বাবার ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ বেদখল ও বঞ্চিত হন হালিমা।

​শোকসভার পরিবেশ মুহূর্তেই রূপ নেয় তীব্র টানাপোড়েনে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। দফায় দফায় চলে দেনদরবার। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং দাফনের পথ সুগম করতে হালিমাকে তাৎক্ষণিক দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বা আপস-রফার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

​তবে সেই আর্থিক প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন ক্ষুব্ধ মেয়ে। তিনি উপস্থিত সবাইকে সাফ জানিয়ে দেন, “আমি কোনো অনুদান বা দয়ার টাকা চাই না; চেয়েছি বাবার রেখে যাওয়া ভিটে ও জমিতে সন্তানের সমান ও আইনসম্মত অধিকার।” দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাবার খাটিয়ায় কাউকে হাত দিতে দেবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

​একদিকে রক্তের টান আর ধর্মীয় অনুশাসন, অন্যদিকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও আর্থিক কূটচাল—এই দুইয়ের মুখোমুখি অবস্থানে পুরো এলাকায় এক ভারী ও অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

​অভিযুক্ত ভাই ইদ্রিস আলীর সঙ্গে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, জমি হস্তান্তরের পেছনের আসল সত্য ও বৈধতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিলপত্র খতিয়ে দেখা জরুরি। ততক্ষণ পর্যন্ত এক পিতার নিথর দেহের সামনে সন্তানের অধিকার আদায়ের এই দৃশ্য পুরো জনপদেই গভীর প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।