
একাত্তরের রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার ও দোসরদের বর্বরোচিত নির্যাতনে সম্ভ্রম হারিয়েও মাথা নত করেননি তিনি। জীবনের দীর্ঘ ৪৫টি বছর বুকে চেপে রেখেছিলেন অবর্ণনীয় যন্ত্রণা আর উপেক্ষার ক্ষত। অবশেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্যালুট আর অশ্রুভেজা ভালোবাসায় চিরবিদায়ের পথে যাত্রা করলেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের সেই সাহসী বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি (৮৪)।
শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় সাদুল্লাপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশে তাঁর কফিনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়। লাল-সবুজের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ফুলমতির মরদেহে গার্ড অব অনার প্রদান করে পুলিশের চৌকস দল। এ সময় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে যায় তাঁর মরদেহ।
এর আগে, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা আর ব্রেন স্ট্রোকের ধকল সামলে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই স্বাধীনতাসংগ্রামী। মৃত্যুকালে তিনি চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। স্বাধীনতার দীর্ঘ সাড়ে চার দশক লোকচক্ষুর আড়ালে নীরবে চোখের জল ফেললেও ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্র তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনা’র স্বীকৃতি দেয়। জীবনের শেষ সময়ে এসে প্রায় দুই বছর ধরে স্ট্রোকে ডান হাত-পা অবশ হয়ে শয্যাশায়ী থাকলেও দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল চিরঅম্লান।
ফুলমতির চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে একাত্তরের ত্যাগের আরেকটি জীবন্ত ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটল। স্থানীয়রা জানান, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পরও জীবনের অধিকাংশ সময় নীরব লড়াইয়ে পার করা ফুলমতি রবিদাস চিরকাল এ দেশের স্বাধীনতা ও নারীর চরম আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








