
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বদলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া হলো নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে। ভবনের ছাদে নেই কোনো নিরাপত্তা রেলিং, বর্ষার পানিতে জমে থাকা শ্যাওলায় ছাদটি চরম পিচ্ছিল, আর ঠিক মাথার ওপর দিয়েই চলে গেছে উচ্চ ভোল্টেজের খোলা বৈদ্যুতিক তার—এমন এক মরণফাঁদে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অবুঝ শিশুদের গাছে তুলে গাছের ডালপালা কাটানোর মতো চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও কাণ্ডজ্ঞানহীন অভিযোগ উঠেছে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধা পৌরসভার আসাদুজ্জামান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের নাম আব্দুল হান্নান। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শিক্ষার্থীদের দিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনি কাজ করানোর সময় বিষয়টি সাংবাদিকদের ক্যামেরায় হাতেনাতে ধরা পড়ে।
অনুসন্ধান ও ধারণকৃত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, স্কুলের পাঠদান বাদ দিয়ে কয়েকজন খুদে শিক্ষার্থীকে তোলা হয়েছে রেলিংবিহীন ভবনের বিপজ্জনক ছাদে। সেখানে চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদ সংলগ্ন একটি গাছে উঠে ডালপালা কাটছে। নিচে পিচ্ছিল মেঝেতে দাঁড়িয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহান খানসহ অন্য শিশুরা সেই কাটা ডাল টেনে নিয়ে ফেলার কাজ করছে।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, যে গাছটিতে ওই শিশুকে ওঠানো হয়েছিল, তার ঠিক পাশ ঘেঁষেই গেছে বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক তার। কাঁচা ডাল কোনোভাবে ওই তারে লাগলে কিংবা পা পিছলে পড়লে কী ভয়াবহ tragedy ঘটতে পারত, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। সামান্য অসাবধানতায় ঘটতে পারত মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনা কিংবা ছাদ থেকে নিচে ছিটকে পড়ে প্রাণহানি।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত গাছ থেকে শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল হান্নান। ক্যামেরা দেখে তড়িঘড়ি করে নিজে ডাল কাটায় হাত লাগান।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা শিশুদের এমন ঝুঁকিতে ফেলার কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, স্কুল আড়াল হয়ে যায় বলে জঙ্গল পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে গাছে তোলেননি। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, খুদে শিশুরা গাছে এবং ছাদে কাটা ডাল সরানোর কাজ করছিল। প্রত্যক্ষ প্রমাণের মুখে প্রধান শিক্ষকের এমন খোঁড়া যুক্তি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটিকে চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতা ও শিশু সুরক্ষা আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল ও অভিভাবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কলেজ অধ্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেখানে শিক্ষকদের দায়িত্ব শিশুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া, সেখানে নিজের খামখেয়ালিপনায় তাদের কার্যত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কোনো অঘটন ঘটলে এই শিক্ষক কি দায় নিতেন?”
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, শিশুদের দিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদ্যালয় কি শিক্ষার আঙিনা, নাকি প্রধান শিক্ষকের খামখেয়ালিপনায় শিশুদের জীবন বাজি রাখার জায়গা—এমন প্রশ্নে এখন ফুঁসছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। এই চরম অবহেলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








