শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১ ঘণ্টার ব্যবধানে দম্পতির মৃত্যু, পাশাপাশি দুই কবর!

সংসারের সুদীর্ঘ পথচলায় তাঁরা ছিলেন একে অপরের ছায়া। সুখ-দুঃখের দিনগুলোতে যে বন্ধন গড়ে উঠেছিল, মৃত্যুও যেন সেই বাঁধন আলগা করতে পারল না। স্বামীকে কবরে নামিয়ে স্বজনদের চোখের জল শুকানোর আগেই চিরবিদায়ের ডাক এলো স্ত্রীরও। দাফন সেরে বাড়ি ফেরার মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে গেল স্ত্রীর জীবনের প্রদীপ। একই দিনে, পাশাপাশি দুটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আমৃত্যু সঙ্গী এক দম্পতি।

​গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মতিনবাজার এলাকার এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও স্তব্ধতা। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যান আব্দুল জলিল (৭০) ও তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগম (৬০)। বুধবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সর্বানন্দ ইউপি চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম।

​পারিবারিক সূত্র জানায়, তাঁদের ভালোবাসার টান ছিল নিয়তির চেয়েও প্রবল। গত ২২ সেপ্টেম্বর হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমিনা বেগম। অর্ধাঙ্গিনীর এমন অসুস্থতা সহ্য করতে পারেননি আব্দুল জলিল; এর মাত্র আড়াই ঘণ্টা পর তিনিও একইভাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দুজনেরই চিকিৎসা চলে। কিছুটা উন্নতির পর আব্দুল জলিলকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও আমিনা বেগম চিকিৎসাধীন ছিলেন।

​সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুল জলিল। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বজনরা যখন ভিজে চোখে আব্দুল জলিলকে চিরবিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, ঠিক তখনই বিকেল ৫টার দিকে খবর আসে—হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আমিনা বেগম।

​একই দিনে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে নির্বাক সন্তানরা। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ছেলে আলম মিয়া বলেন, “বাবা-মায়ের মধ্যকার বোঝাপড়া আর ভালোবাসা ছিল কল্পনাতীত। অসুস্থও হলেন একসঙ্গে, বিদায়ও নিলেন একসঙ্গে। বাবাকে কবরে শুইয়ে বাড়ি ফিরে নিঃশ্বাস ফেলার আগেই মায়ের মৃত্যুর খবর এলো। একই দিনে আমরা একসঙ্গে পুরোপুরি এতিম হয়ে গেলাম।”

​পরে মঙ্গলবার বাদ মাগরিব আমিনা বেগমের জানাজা সম্পন্ন হয়। স্বামীর কবরের ঠিক পাশেই খোঁড়া হয় তাঁর শেষ ঠিকানা।

​সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, “একই পরিবারের এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুজনের যে আত্মিক টান ছিল, তা এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পুরো পরিবারটি আজ বাকরুদ্ধ, আমরা তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।”

​জীবনের লম্বা সফরে যেমন এক ছাদের নিচে ছিলেন, অনন্তকালের সফরেও তাঁরা রইলেন পাশাপাশি—পারিবারিক কবরস্থানের দুটি মাটির ঢিবি এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার।

জনপ্রিয়

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুকে মেলা: চেম্বারের সাইনবোর্ডে বহিরাগত চক্রের হরিলুট

error: Content is protected !!

১ ঘণ্টার ব্যবধানে দম্পতির মৃত্যু, পাশাপাশি দুই কবর!

প্রকাশের সময়: ১১:৪৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সংসারের সুদীর্ঘ পথচলায় তাঁরা ছিলেন একে অপরের ছায়া। সুখ-দুঃখের দিনগুলোতে যে বন্ধন গড়ে উঠেছিল, মৃত্যুও যেন সেই বাঁধন আলগা করতে পারল না। স্বামীকে কবরে নামিয়ে স্বজনদের চোখের জল শুকানোর আগেই চিরবিদায়ের ডাক এলো স্ত্রীরও। দাফন সেরে বাড়ি ফেরার মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে গেল স্ত্রীর জীবনের প্রদীপ। একই দিনে, পাশাপাশি দুটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আমৃত্যু সঙ্গী এক দম্পতি।

​গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের সাহাবাজ মতিনবাজার এলাকার এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও স্তব্ধতা। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে মারা যান আব্দুল জলিল (৭০) ও তাঁর স্ত্রী আমিনা বেগম (৬০)। বুধবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সর্বানন্দ ইউপি চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম।

​পারিবারিক সূত্র জানায়, তাঁদের ভালোবাসার টান ছিল নিয়তির চেয়েও প্রবল। গত ২২ সেপ্টেম্বর হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমিনা বেগম। অর্ধাঙ্গিনীর এমন অসুস্থতা সহ্য করতে পারেননি আব্দুল জলিল; এর মাত্র আড়াই ঘণ্টা পর তিনিও একইভাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দুজনেরই চিকিৎসা চলে। কিছুটা উন্নতির পর আব্দুল জলিলকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও আমিনা বেগম চিকিৎসাধীন ছিলেন।

​সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুল জলিল। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বজনরা যখন ভিজে চোখে আব্দুল জলিলকে চিরবিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, ঠিক তখনই বিকেল ৫টার দিকে খবর আসে—হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আমিনা বেগম।

​একই দিনে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে নির্বাক সন্তানরা। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ছেলে আলম মিয়া বলেন, “বাবা-মায়ের মধ্যকার বোঝাপড়া আর ভালোবাসা ছিল কল্পনাতীত। অসুস্থও হলেন একসঙ্গে, বিদায়ও নিলেন একসঙ্গে। বাবাকে কবরে শুইয়ে বাড়ি ফিরে নিঃশ্বাস ফেলার আগেই মায়ের মৃত্যুর খবর এলো। একই দিনে আমরা একসঙ্গে পুরোপুরি এতিম হয়ে গেলাম।”

​পরে মঙ্গলবার বাদ মাগরিব আমিনা বেগমের জানাজা সম্পন্ন হয়। স্বামীর কবরের ঠিক পাশেই খোঁড়া হয় তাঁর শেষ ঠিকানা।

​সর্বানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, “একই পরিবারের এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুজনের যে আত্মিক টান ছিল, তা এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পুরো পরিবারটি আজ বাকরুদ্ধ, আমরা তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।”

​জীবনের লম্বা সফরে যেমন এক ছাদের নিচে ছিলেন, অনন্তকালের সফরেও তাঁরা রইলেন পাশাপাশি—পারিবারিক কবরস্থানের দুটি মাটির ঢিবি এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার।