বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশ্বাসের ফানুসে তিস্তায় বিলীন সুন্দরগঞ্জের ‘ভোরের পাখি’ স্কুল!পাউবোর উদাসীনতায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দফায় দফায় পরিদর্শন আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি—কোনো কিছুই কাজে এলো না গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ রক্ষায়। তিস্তার তীব্র ভাঙনে অবশেষে চর এলাকার শত শত শিশুর শিক্ষার একমাত্র ভরসাস্থল বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চরম উদাসীনতা ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

​গত ৮ আগস্ট স্বয়ং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার আগে ও পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক এবং পাউবো কর্মকর্তারা একের পর এক পরিদর্শন করে শুধু আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, এমনকি নদীভাঙন ঠেকাতে একটি জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি স্কুল প্রাঙ্গণে।

​সরেজমিনে দেখা যায়, তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়টির টিন ও মালামাল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ভবনের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চয়তায়।
​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গতকালও বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান হয়েছে। ভোরে ভাঙন তীব্র হলে তাৎক্ষণিকভাবে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাই। তাঁর নির্দেশে ১৪ জন শ্রমিক নিয়ে মালামাল সরানোর কাজ শুরু করি। সংশ্লিষ্ট সবাই শুধু পরিদর্শন করে গেছেন, বিদ্যালয়টি রক্ষায় একটি জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি। সময়মতো উদ্যোগ নিলে স্কুলটি রক্ষা পেত।

​প্রশাসনের চরম গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করে কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন বলেন, “টিও, এটিও, ইউএনও, পাউবো এবং ডিসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা স্কুলটি পরিদর্শনে এসে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। অথচ বাস্তবতা হলো, বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো কাজই করা হয়নি। এটি স্পষ্টত প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

​সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মন জানান, ভাঙন শুরুর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দফায় দফায় অবহিত করা হলেও তারা সময়মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙন তীব্র হওয়ায় দ্রুত প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বিদ্যালয় রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

​বিদ্যালয় রক্ষায় কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম দায়সারাভাবে জানান, বিদ্যালয় রক্ষায় এবার আলাদা কোনো জিও ব্যাগের বরাদ্দ ছিল না। তবে খবর পাওয়ার পর এখন দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতি চলছে।

​এদিকে বিদ্যালয়টি বিলীন হওয়ার মুখে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘাটতি নিয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।

জনপ্রিয়

আশ্বাসের ফানুসে তিস্তায় বিলীন সুন্দরগঞ্জের ‘ভোরের পাখি’ স্কুল!পাউবোর উদাসীনতায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ

error: Content is protected !!

আশ্বাসের ফানুসে তিস্তায় বিলীন সুন্দরগঞ্জের ‘ভোরের পাখি’ স্কুল!পাউবোর উদাসীনতায় ক্ষোভের বিস্ফোরণ

প্রকাশের সময়: ০৪:৫৫:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দফায় দফায় পরিদর্শন আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি—কোনো কিছুই কাজে এলো না গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ রক্ষায়। তিস্তার তীব্র ভাঙনে অবশেষে চর এলাকার শত শত শিশুর শিক্ষার একমাত্র ভরসাস্থল বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চরম উদাসীনতা ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।

​গত ৮ আগস্ট স্বয়ং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার আগে ও পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক এবং পাউবো কর্মকর্তারা একের পর এক পরিদর্শন করে শুধু আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, এমনকি নদীভাঙন ঠেকাতে একটি জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি স্কুল প্রাঙ্গণে।

​সরেজমিনে দেখা যায়, তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়টির টিন ও মালামাল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ভবনের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চয়তায়।
​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গতকালও বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান হয়েছে। ভোরে ভাঙন তীব্র হলে তাৎক্ষণিকভাবে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাই। তাঁর নির্দেশে ১৪ জন শ্রমিক নিয়ে মালামাল সরানোর কাজ শুরু করি। সংশ্লিষ্ট সবাই শুধু পরিদর্শন করে গেছেন, বিদ্যালয়টি রক্ষায় একটি জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি। সময়মতো উদ্যোগ নিলে স্কুলটি রক্ষা পেত।

​প্রশাসনের চরম গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করে কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন বলেন, “টিও, এটিও, ইউএনও, পাউবো এবং ডিসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা স্কুলটি পরিদর্শনে এসে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। অথচ বাস্তবতা হলো, বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো কাজই করা হয়নি। এটি স্পষ্টত প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

​সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মন জানান, ভাঙন শুরুর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দফায় দফায় অবহিত করা হলেও তারা সময়মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙন তীব্র হওয়ায় দ্রুত প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বিদ্যালয় রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

​বিদ্যালয় রক্ষায় কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম দায়সারাভাবে জানান, বিদ্যালয় রক্ষায় এবার আলাদা কোনো জিও ব্যাগের বরাদ্দ ছিল না। তবে খবর পাওয়ার পর এখন দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতি চলছে।

​এদিকে বিদ্যালয়টি বিলীন হওয়ার মুখে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘাটতি নিয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।