রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধা কলেজিয়েট স্কুলে দুর্নীতির মহোৎসব: উপবৃত্তি লোপাট, প্রাইভেট সিন্ডিকেট ও প্রশ্ন ফাঁসে ধ্বংসের মুখে ঐতিহ্য

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: ০১:৩৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১০৫ বার পড়া হয়েছে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি অর্থ লুটের আখড়া? গাইবান্ধার অর্ধশতকের ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন দুর্নীতির বিষবাষ্পে জর্জরিত। দুই শিক্ষকের কাদা ছোড়াছুড়িতে বেরিয়ে এসেছে সরকারি উপবৃত্তির টাকা লোপাট, পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন বিক্রি, স্কুলের ভেতরে অবৈধ প্রাইভেট শাখা খুলে কোটি টাকার বাণিজ্য এবং বেপরোয়া শিক্ষক সিন্ডিকেটের ভয়ংকর সব তথ্য। প্রতিষ্ঠানের সুনাম মাটিতে মিশতে বসায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা; দাবি উঠেছে দুর্নীতিবাজদের অবিলম্বে বরখাস্তের।

​১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় ৩২টি বৃত্তি পেয়ে জেলায় দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করে। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অনৈতিকতার যে জাল বিস্তার করা হয়েছে, তা সম্প্রতি ফাঁস হয়ে পড়ায় হতবাক পুরো গাইবান্ধা।

অনুসন্ধানে মেলে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক জালিয়াতির চিত্র। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছয়জন অসহায় শিক্ষার্থীর সরকারি উপবৃত্তির অর্থ সোজা নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে নেন প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা বেগম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রমাণসহ বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর এবং তদন্তের মুখে পড়ার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে অভিভাবকদের টাকা ফেরত দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালান তিনি। সরকারি অর্থ আত্মসাতের এমন স্পষ্ট প্রমাণ মেলার পরও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যালয়টিতে চলা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, সহকারী শিক্ষক মাহাফুজা আক্তার সোনালী, আফরিন আক্তার, তামান্না তানজিলা তুলি, রহিমা খাতুন ও লেলিনা আকতার লিয়া স্কুলের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রাইভেট বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন। শিক্ষার্থী প্রতি মাসে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা না দিলে মেলে না ক্লাসের মনোযোগ। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেটের অনুগত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকেই পরীক্ষার পুরো উত্তরপত্র লিখে এনে জমা দেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়লে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

​এছাড়া পরীক্ষা না নিয়েই শারীরিক শিক্ষা ও চারু-কারু বিষয়ের নামে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা আদায় এবং ভর্তির সময় ফ্যান কেনার অজুহাতে অবৈধ টাকা হাতানোর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা প্রাক-প্রাথমিকে চালু করেছেন অবৈধ বাণিজ্য। সরকারি একটি শাখার বাইরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আরও তিনটি ‘বেসরকারি শাখা’ খুলে লায়লা, সাথী ও শামীমা নামের তিনজনকে দিয়ে স্কুল সময়ের আগে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ভর্তি ফরম ১০০ টাকা এবং মাসিক বেতন ৫০০ টাকা ধরে প্রায় শতাধিক শিশুর কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক নিজে।

প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা ও সহকারী শিক্ষক লেলিনা আকতারের কোচিংয়ের ভাগ-বাটোয়ারা ও ব্যক্তিগত বিরোধ চরমে পৌঁছালে জেলা শিক্ষা অফিসে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দায়ের হয়। লেলিনা আকতারের স্বামী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হেনস্তার অভিযোগ আনেন, আর প্রধান শিক্ষক অভিযোগ দেন লিয়ার প্রাইভেট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির থলের বিড়াল প্রকাশ্যে আসতেই এখন তড়িঘড়ি করে ‘সমঝোতা’র নাটক সাজানো হচ্ছে।

​অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা দায় এড়িয়ে বলেন, “তৃতীয় পক্ষের কারণে বিরোধ হয়েছিল, তদন্তের পর সব সমঝোতা হয়ে গেছে। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।” সরকারি অর্থ লোপাট ও অনিয়মের বিচার কীভাবে ব্যক্তিগত সমঝোতায় শেষ হতে পারে—সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম জানান, “সমঝোতার কথা বলা হলেও তদন্তে পাওয়া আর্থিক অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো তথ্যই গোপন রাখা হবে না।”

​জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাশ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রাইভেট সিন্ডিকেট চালানোর সুযোগ কারও নেই। জেলা ও সদর পর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জনপ্রিয়

গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে টেন্ডার জালিয়াতির মহোৎসব: নেপথ্যে তত্ত্বাবধায়ক লিংকন ও হিসাবরক্ষক হিরু

error: Content is protected !!

গাইবান্ধা কলেজিয়েট স্কুলে দুর্নীতির মহোৎসব: উপবৃত্তি লোপাট, প্রাইভেট সিন্ডিকেট ও প্রশ্ন ফাঁসে ধ্বংসের মুখে ঐতিহ্য

প্রকাশের সময়: ০১:৩৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি অর্থ লুটের আখড়া? গাইবান্ধার অর্ধশতকের ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন দুর্নীতির বিষবাষ্পে জর্জরিত। দুই শিক্ষকের কাদা ছোড়াছুড়িতে বেরিয়ে এসেছে সরকারি উপবৃত্তির টাকা লোপাট, পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন বিক্রি, স্কুলের ভেতরে অবৈধ প্রাইভেট শাখা খুলে কোটি টাকার বাণিজ্য এবং বেপরোয়া শিক্ষক সিন্ডিকেটের ভয়ংকর সব তথ্য। প্রতিষ্ঠানের সুনাম মাটিতে মিশতে বসায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা; দাবি উঠেছে দুর্নীতিবাজদের অবিলম্বে বরখাস্তের।

​১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় ৩২টি বৃত্তি পেয়ে জেলায় দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করে। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অনৈতিকতার যে জাল বিস্তার করা হয়েছে, তা সম্প্রতি ফাঁস হয়ে পড়ায় হতবাক পুরো গাইবান্ধা।

অনুসন্ধানে মেলে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক জালিয়াতির চিত্র। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছয়জন অসহায় শিক্ষার্থীর সরকারি উপবৃত্তির অর্থ সোজা নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে নেন প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা বেগম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রমাণসহ বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর এবং তদন্তের মুখে পড়ার আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে অভিভাবকদের টাকা ফেরত দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালান তিনি। সরকারি অর্থ আত্মসাতের এমন স্পষ্ট প্রমাণ মেলার পরও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যালয়টিতে চলা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, সহকারী শিক্ষক মাহাফুজা আক্তার সোনালী, আফরিন আক্তার, তামান্না তানজিলা তুলি, রহিমা খাতুন ও লেলিনা আকতার লিয়া স্কুলের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রাইভেট বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন। শিক্ষার্থী প্রতি মাসে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা না দিলে মেলে না ক্লাসের মনোযোগ। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেটের অনুগত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকেই পরীক্ষার পুরো উত্তরপত্র লিখে এনে জমা দেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়লে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

​এছাড়া পরীক্ষা না নিয়েই শারীরিক শিক্ষা ও চারু-কারু বিষয়ের নামে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা আদায় এবং ভর্তির সময় ফ্যান কেনার অজুহাতে অবৈধ টাকা হাতানোর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা প্রাক-প্রাথমিকে চালু করেছেন অবৈধ বাণিজ্য। সরকারি একটি শাখার বাইরে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আরও তিনটি ‘বেসরকারি শাখা’ খুলে লায়লা, সাথী ও শামীমা নামের তিনজনকে দিয়ে স্কুল সময়ের আগে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ভর্তি ফরম ১০০ টাকা এবং মাসিক বেতন ৫০০ টাকা ধরে প্রায় শতাধিক শিশুর কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক নিজে।

প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা ও সহকারী শিক্ষক লেলিনা আকতারের কোচিংয়ের ভাগ-বাটোয়ারা ও ব্যক্তিগত বিরোধ চরমে পৌঁছালে জেলা শিক্ষা অফিসে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দায়ের হয়। লেলিনা আকতারের স্বামী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে হেনস্তার অভিযোগ আনেন, আর প্রধান শিক্ষক অভিযোগ দেন লিয়ার প্রাইভেট বাণিজ্যের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির থলের বিড়াল প্রকাশ্যে আসতেই এখন তড়িঘড়ি করে ‘সমঝোতা’র নাটক সাজানো হচ্ছে।

​অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক আরজুমান আরা দায় এড়িয়ে বলেন, “তৃতীয় পক্ষের কারণে বিরোধ হয়েছিল, তদন্তের পর সব সমঝোতা হয়ে গেছে। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।” সরকারি অর্থ লোপাট ও অনিয়মের বিচার কীভাবে ব্যক্তিগত সমঝোতায় শেষ হতে পারে—সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম জানান, “সমঝোতার কথা বলা হলেও তদন্তে পাওয়া আর্থিক অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো তথ্যই গোপন রাখা হবে না।”

​জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাশ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রাইভেট সিন্ডিকেট চালানোর সুযোগ কারও নেই। জেলা ও সদর পর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”