শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুকে মেলা: চেম্বারের সাইনবোর্ডে বহিরাগত চক্রের হরিলুট

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময়: ০৩:৩৪:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩৮ বার পড়া হয়েছে

ব্যাপক গণদাবি ও জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাইবান্ধা শহরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন এলাকায় শুরু হয়েছে মাসব্যাপী কথিত শিল্প ও বাণিজ্য মেলা। শহরের ভিএইডডি রোডে সদর উপজেলা মডেল স্কুল ও কলেজ সংলগ্ন পরিত্যক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কোয়ার্টার মাঠে ঘটা করে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। স্পর্শকাতর একটি এলাকায় এমন আয়োজনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে।

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেলা প্রাঙ্গণটির একেবারেই কোল ঘেঁষে রয়েছে গণপূর্ত অফিস, পিটিআই, পিটিআই পরীক্ষণ বিদ্যালয়, কৃষি ইনস্টিটিউট, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, সরকারি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উপজেলা পরিষদ কার্যালয়, হর্টিকালচার ইনস্টিটিউট, আদর্শ ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়সহ একাধিক মসজিদ ও মন্দির। এমন সংবেদনশীল প্রশাসনিক ও শিক্ষা জোনে কীভাবে একটি বাণিজ্যিক মেলার অনুমোদন দেওয়া হলো, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

​সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে মেলার মূল আয়োজক নিয়ে। কাগজে-কলমে এটি ‘গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র আয়োজন বলা হলেও, ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের স্পষ্ট অভিযোগ—এখানে চেম্বারের নাম ও প্রভাবকে স্রেফ সাইনবোর্ড হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নেপথ্যে পুরো মেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন দিনাজপুরের এক বিতর্কিত ‘মেলা ব্যবসায়ী’। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে মেলার নামে বাণিজ্যিক ফায়দা লোটা যার মূল কাজ।

​নিয়মানুযায়ী শিল্প ও বাণিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শিল্পপণ্যের প্রচার ও প্রসার। অথচ এই মেলায় স্থানীয় উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের কোনো দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। লোকদেখানো দু-একটি স্টল বসিয়ে পুরো মাঠ দখলে নিয়েছে বাইরের ব্যবসায়ীরা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন—স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের গলা টিপে বহিরাগত সিন্ডিকেটের স্বার্থ হাসিল করাই কি তবে গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্সের কাজ?

​এদিকে মেলা শুরু হতেই মারাত্মক ধস নেমেছে শহরের স্থানীয় ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রিতে। তীব্র লোডশেডিং আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই দুঃসময়ে মেলা তাদের রুটিরুজির ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের ব্যবসা লাটে উঠেছে, সংসার চালানোই দায়। অথচ প্রশাসন বাইরে থেকে লোক এনে আমাদের পেটে লাথি মারার ব্যবস্থা করে দিল।”
​এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক ড. মনিরুজ্জামান দায়সারা মন্তব্য করে বলেন, চেম্বার অব কমার্সের আবেদনের প্রেক্ষিতেই মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্কুলের পাশে মেলার বিষয়ে তাঁর অদ্ভুত যুক্তি—”স্কুল চলে দুপুর পর্যন্ত আর মেলা শুরু হয় বিকেলে।” তিনি আরও বলেন, “বাণিজ্য মেলা চলবে এক মাস, আর ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন সারা বছর।

​জেলা প্রশাসনের এমন উদাসীন ও অসংবেদনশীল জবাবে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতন মহলের মতে, স্কুল-কলেজ ও সরকারি দপ্তরের নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস করে কার পকেট ভারী করতে এই মেলার আয়োজন—তা এখন খতিয়ে দেখা জরুরি। অবিলম্বে এই বিতর্কিত মেলা বন্ধ অথবা শহরের বাইরে কোনো উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শহরবাসী।

জনপ্রিয়

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুকে মেলা: চেম্বারের সাইনবোর্ডে বহিরাগত চক্রের হরিলুট

error: Content is protected !!

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুকে মেলা: চেম্বারের সাইনবোর্ডে বহিরাগত চক্রের হরিলুট

প্রকাশের সময়: ০৩:৩৪:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাপক গণদাবি ও জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাইবান্ধা শহরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন এলাকায় শুরু হয়েছে মাসব্যাপী কথিত শিল্প ও বাণিজ্য মেলা। শহরের ভিএইডডি রোডে সদর উপজেলা মডেল স্কুল ও কলেজ সংলগ্ন পরিত্যক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কোয়ার্টার মাঠে ঘটা করে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। স্পর্শকাতর একটি এলাকায় এমন আয়োজনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে।

​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেলা প্রাঙ্গণটির একেবারেই কোল ঘেঁষে রয়েছে গণপূর্ত অফিস, পিটিআই, পিটিআই পরীক্ষণ বিদ্যালয়, কৃষি ইনস্টিটিউট, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, সরকারি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উপজেলা পরিষদ কার্যালয়, হর্টিকালচার ইনস্টিটিউট, আদর্শ ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়সহ একাধিক মসজিদ ও মন্দির। এমন সংবেদনশীল প্রশাসনিক ও শিক্ষা জোনে কীভাবে একটি বাণিজ্যিক মেলার অনুমোদন দেওয়া হলো, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

​সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে মেলার মূল আয়োজক নিয়ে। কাগজে-কলমে এটি ‘গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র আয়োজন বলা হলেও, ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের স্পষ্ট অভিযোগ—এখানে চেম্বারের নাম ও প্রভাবকে স্রেফ সাইনবোর্ড হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নেপথ্যে পুরো মেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন দিনাজপুরের এক বিতর্কিত ‘মেলা ব্যবসায়ী’। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে মেলার নামে বাণিজ্যিক ফায়দা লোটা যার মূল কাজ।

​নিয়মানুযায়ী শিল্প ও বাণিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শিল্পপণ্যের প্রচার ও প্রসার। অথচ এই মেলায় স্থানীয় উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের কোনো দৃশ্যমান সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। লোকদেখানো দু-একটি স্টল বসিয়ে পুরো মাঠ দখলে নিয়েছে বাইরের ব্যবসায়ীরা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন—স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের গলা টিপে বহিরাগত সিন্ডিকেটের স্বার্থ হাসিল করাই কি তবে গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্সের কাজ?

​এদিকে মেলা শুরু হতেই মারাত্মক ধস নেমেছে শহরের স্থানীয় ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেচাবিক্রিতে। তীব্র লোডশেডিং আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই দুঃসময়ে মেলা তাদের রুটিরুজির ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের ব্যবসা লাটে উঠেছে, সংসার চালানোই দায়। অথচ প্রশাসন বাইরে থেকে লোক এনে আমাদের পেটে লাথি মারার ব্যবস্থা করে দিল।”
​এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক ড. মনিরুজ্জামান দায়সারা মন্তব্য করে বলেন, চেম্বার অব কমার্সের আবেদনের প্রেক্ষিতেই মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্কুলের পাশে মেলার বিষয়ে তাঁর অদ্ভুত যুক্তি—”স্কুল চলে দুপুর পর্যন্ত আর মেলা শুরু হয় বিকেলে।” তিনি আরও বলেন, “বাণিজ্য মেলা চলবে এক মাস, আর ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন সারা বছর।

​জেলা প্রশাসনের এমন উদাসীন ও অসংবেদনশীল জবাবে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতন মহলের মতে, স্কুল-কলেজ ও সরকারি দপ্তরের নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস করে কার পকেট ভারী করতে এই মেলার আয়োজন—তা এখন খতিয়ে দেখা জরুরি। অবিলম্বে এই বিতর্কিত মেলা বন্ধ অথবা শহরের বাইরে কোনো উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শহরবাসী।