বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিআইও সিন্ডিকেটের পেটে মসজিদ-মন্দির-কবরস্থানের বরাদ্দ: গাইবান্ধায় হরিলুটের মহোৎসব!

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্তিম শয়ানের কবরস্থান—কোনো কিছুই বাদ যায়নি গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দপ্তরের দুর্নীতির আগ্রাসন থেকে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের (টিআর, কাবিখা ও কাবিটা) সরকারি অর্থ প্রকাশ্যেই হরিলুট করেছে পিআইও, অসাধু জনপ্রতিনিধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সমন্বয়ে গঠিত এক বেপরোয়া সিন্ডিকেট। ২০২৩-২৪ থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত অন্তত তিন অর্থবছরে নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ কেটে রেখে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

​সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পিআইও অফিসের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্প ‘কেনাবেচা’ হয়েছে। কোথাও বরাদ্দের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও অর্ধেক গায়েব করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দ শতভাগ তুলে নেওয়া হলেও কাজের অস্তিত্ব কেবল কাগজে-কলমে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে টিআরের আওতায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ মসজিদ কমিটিকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। বাকি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার কোনো হদিস নেই।

​প্রকল্পটির সভাপতি ও মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার জানান, তিনি কেবল চেকে সই করেছেন, বাকি কাজ করেছে সাবেক ইউপি সদস্যের স্বামী সারোয়ার। সারোয়ার প্রকাশ্যেই দম্ভভরে বলেন, “মসজিদকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়, আমি টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি।”

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর উত্তরপাড়া কবরস্থান সংস্কার’ প্রকল্পে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ এলেও এক পয়সাও পায়নি কবরস্থান কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শতবর্ষী এই কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সরকারি অর্থ পুরোপুরি গিলে খেয়েছে সিন্ডিকেট।

​একই এলাকার কাবিখা ৩য় পর্যায়ের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পের নামে ৫ দশমিক ৩৪৩ টন গম বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে কোনো রাস্তার অস্তিত্ব মেলেনি; কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ির উঠানকে ‘রাস্তা’ বানিয়ে সরকারি সম্পদ লোপাট করেছেন ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ থেকে সরাসরি অর্ধেক টাকা কেটে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে মন্দিরকে দেওয়া হয় মাত্র ২৬ হাজার টাকা। বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় ‘টাকা শেষ’। ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মসজিদ পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের সভাপতি জাকিরুলের কাছ থেকে ফাঁকা চেকে সই নিয়ে বাকি টাকা লোপাট করা হয়।

​এ বিষয়ে লক্ষীপুর ইউপির সদস্য গোলাম মোস্তফা সরাসরি স্বীকার করেন, “পিআইও সাহেব অর্ধেক টাকার শর্তেই প্রকল্প বরাদ্দ দেন। পিআইও সাহেবের শর্ত না মানলে কোনো প্রকল্পই পাওয়া যায় না। উনি মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও ছাড়েন না।”

হরিলুটের বিষয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং দায় এড়াতে সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলীর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।

​সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক বলেন, “সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি পয়সা যথাযথভাবে ব্যবহারের নিয়ম। মসজিদ-মন্দির বা কবরস্থানের বরাদ্দে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

​জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।

জনপ্রিয়

পিআইও সিন্ডিকেটের পেটে মসজিদ-মন্দির-কবরস্থানের বরাদ্দ: গাইবান্ধায় হরিলুটের মহোৎসব!

error: Content is protected !!

পিআইও সিন্ডিকেটের পেটে মসজিদ-মন্দির-কবরস্থানের বরাদ্দ: গাইবান্ধায় হরিলুটের মহোৎসব!

প্রকাশের সময়: ১১:৩১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্তিম শয়ানের কবরস্থান—কোনো কিছুই বাদ যায়নি গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দপ্তরের দুর্নীতির আগ্রাসন থেকে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের (টিআর, কাবিখা ও কাবিটা) সরকারি অর্থ প্রকাশ্যেই হরিলুট করেছে পিআইও, অসাধু জনপ্রতিনিধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সমন্বয়ে গঠিত এক বেপরোয়া সিন্ডিকেট। ২০২৩-২৪ থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত অন্তত তিন অর্থবছরে নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ কেটে রেখে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

​সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পিআইও অফিসের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্প ‘কেনাবেচা’ হয়েছে। কোথাও বরাদ্দের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও অর্ধেক গায়েব করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দ শতভাগ তুলে নেওয়া হলেও কাজের অস্তিত্ব কেবল কাগজে-কলমে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে টিআরের আওতায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ মসজিদ কমিটিকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। বাকি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার কোনো হদিস নেই।

​প্রকল্পটির সভাপতি ও মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার জানান, তিনি কেবল চেকে সই করেছেন, বাকি কাজ করেছে সাবেক ইউপি সদস্যের স্বামী সারোয়ার। সারোয়ার প্রকাশ্যেই দম্ভভরে বলেন, “মসজিদকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনাবেচা হয়, আমি টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি।”

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর উত্তরপাড়া কবরস্থান সংস্কার’ প্রকল্পে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ এলেও এক পয়সাও পায়নি কবরস্থান কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শতবর্ষী এই কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সরকারি অর্থ পুরোপুরি গিলে খেয়েছে সিন্ডিকেট।

​একই এলাকার কাবিখা ৩য় পর্যায়ের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পের নামে ৫ দশমিক ৩৪৩ টন গম বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে কোনো রাস্তার অস্তিত্ব মেলেনি; কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ির উঠানকে ‘রাস্তা’ বানিয়ে সরকারি সম্পদ লোপাট করেছেন ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ থেকে সরাসরি অর্ধেক টাকা কেটে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে মন্দিরকে দেওয়া হয় মাত্র ২৬ হাজার টাকা। বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় ‘টাকা শেষ’। ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মসজিদ পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের সভাপতি জাকিরুলের কাছ থেকে ফাঁকা চেকে সই নিয়ে বাকি টাকা লোপাট করা হয়।

​এ বিষয়ে লক্ষীপুর ইউপির সদস্য গোলাম মোস্তফা সরাসরি স্বীকার করেন, “পিআইও সাহেব অর্ধেক টাকার শর্তেই প্রকল্প বরাদ্দ দেন। পিআইও সাহেবের শর্ত না মানলে কোনো প্রকল্পই পাওয়া যায় না। উনি মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন না, কবরস্থানের টাকাও ছাড়েন না।”

হরিলুটের বিষয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং দায় এড়াতে সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলীর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।

​সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক বলেন, “সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি পয়সা যথাযথভাবে ব্যবহারের নিয়ম। মসজিদ-মন্দির বা কবরস্থানের বরাদ্দে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

​জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ধর্মীয় বা সামাজিক প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।