
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাস কি তবে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে? এক শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক নৃশংসতা, চাঁদাবাজি, মাদক সিন্ডিকেট এবং ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সর্বশেষ গত ৩০ জুন এক আইন অনুষদের শিক্ষার্থীকে কটেজে ঢুকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর এই আতঙ্ক রূপ নিয়েছে তীব্র ক্ষোভে।
অভিযুক্ত এই শিক্ষার্থীর নাম আলমাস মাহফুজ রাফিদ। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক অপরাধ করলেও প্রশাসনের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তায় সে বারবার পার পেয়ে গেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ জুন (২০২৬) রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি কটেজে স্থানীয় একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীকে সাথে নিয়ে হামলা চালায় রাফিদ। সেখানে আইন অনুষদের এক শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
ঘটনার পরপরই চবি সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী, এলাকাবাসী এবং কটেজের বাড়িওয়ালা (যিনি ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সাবেক প্রভাষক ড. আলী আহমদের স্ত্রী এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ফেরদোসীর আলমের মা) সরাসরি সহকারী প্রক্টরকে ঘটনার বিবরণ দেন। সহকারী প্রক্টর তাৎক্ষণিকভাবে আহত শিক্ষার্থীর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও এই ঘটনার পর থেকে পুরো ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ছাত্রীদের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি ও যৌন হয়রানি
শুধু মারধর বা কোপানোই নয়, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক এই রাফিদ। অভিযোগ রয়েছে, ২৩-২৪ সেশনের চারুকলা ইনস্টিটিউটের এক নারী শিক্ষার্থীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়ে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় সে। এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় ভুক্তভোগী ও তার পাশে দাঁড়ানো সহপাঠীদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে এথিন সরকার ইউশা নামক এক শিক্ষার্থী থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,”সে এখনো নিয়মিত বিভিন্ন নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করে যাচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছাত্রীরা মান-সম্মানের ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না। অতীতে বড় অপরাধ করেও সে আমালতান্ত্রিক জটিলতায় পার পেয়ে গেছে, তাই প্রশাসনের ওপরও আমরা ভরসা পাচ্ছি না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই সাবেক ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ‘ভিএক্স’ গ্রুপের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার শুরু করে রাফিদ। সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একাধিক শিক্ষার্থীকে মারধরের ইতিহাস রয়েছে তার। এর আগে ‘স্বাগত দেশ’ ও ‘তুষার দে’ নামের দুই শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও, সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে লোকাল মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার মূল হোতা হিসেবে রাফিদের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী যুবকদের সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভুয়া পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পাসে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
একের পর এক লিখিত অভিযোগ, থানায় জিডি এবং প্রক্টোরিয়াল বডির সামনে সরাসরি সাক্ষ্য থাকার পরও রাফিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে এই অপরাধীকে আর কতদিন ছাড় দেওয়া হবে—এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন চবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এই ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করতে এবং আর কোনো রক্ত ঝরার আগেই এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
















